
সিলেট নগরের রায়নগর এলাকায় একই বাসায় তিনজনকে হত্যার ঘটনায় রহস্যের জট খুলেছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরে ওই বাসায় যাওয়া বাবুল মিয়াই একাই তিনজনকে হত্যা করেছে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে আটক করা হয়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে মিতালি আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ও সাবেক কয়লা ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের (২৫) মরদেহ।
স্থানীয়রা বাসার দরজার নিচ দিয়ে রক্ত বের হতে দেখে সন্দেহ করেন। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। সেখান থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পিবিআই ও সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে।
শুরুতে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ডাকাতি, পারিবারিক বিরোধ কিংবা সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বসহ বিভিন্ন কারণের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেয় পুলিশ। দ্রুত তদন্তের অংশ হিসেবে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়।
ফুটেজ বিশ্লেষণে লাল রঙের টি-শার্ট ও মাথায় ক্যাপ পরা এক ব্যক্তির চলাচল তদন্তকারীদের নজরে আসে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালায় পুলিশ। একপর্যায়ে রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনি থেকে নূর মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল তিনজনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি বাসার পাশের একটি জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে ফেলে রাখা হয়েছিল। তবে সেখানে অভিযান চালিয়েও এখন পর্যন্ত ছুরিটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বুধবার সকালে তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতে ওই বাসায় যায় সে। তাহমিনার অনুমতি নিয়েই বাসায় প্রবেশের পর একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্যে বাবুল দাবি করেছে, একটি অনৈতিক প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
এ সময় বাবুলের হাতে থাকা ছুরির আঘাতে তাহমিনা গুরুতর আহত হয়ে মারা যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁর চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম সেখানে এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে শব্দ শুনে আব্দুস সাত্তার ঘর থেকে বেরিয়ে এলে তিনিও হামলার শিকার হন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনজনকে হত্যার পর বাবুল বাসার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে বেলকনি দিয়ে বের হয়ে যায়। পরে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি কাছের একটি জঙ্গলে ফেলে দেয়। এরপরও সে সিলেট ছেড়ে পালায়নি; রায়নগর এলাকাতেই অবস্থান করছিল।
সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) শিপলু চৌধুরী জানান, বাবুল মিয়া পেশায় রংমিস্ত্রি। পাশাপাশি সে মাঝেমধ্যে কসাইয়ের কাজও করত। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কসাইয়ের কাজের সময় তার কাছে থাকা ছুরিই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করা হয়েছে।
এদিকে এক বাসায় একই পরিবারের দুই সদস্য ও গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় রায়নগরসহ পুরো সিলেটে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যে সন্দেহভাজনকে শনাক্ত ও আটক করতে পারায় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য করুন