
একদিকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত করার দায়িত্ব, অন্যদিকে বছরের পর বছর কোনো নিয়মিত বেতন-ভাতা ছাড়াই পাঠদান—এভাবেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন ২০১৩ সালের জাতীয়করণ কার্যক্রমের বাইরে থাকা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। দীর্ঘদিনের এই বঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে এসব বিদ্যালয় দ্রুত জাতীয়করণের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
শিক্ষকদের দাবি, ২০১৩ সালে দেশের ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হলেও বিভিন্ন জটিলতা ও বাস্তবতার কারণে তিন পার্বত্য অঞ্চল, সাবেক ছিটমহলসহ দেশের প্রায় ৫ হাজার বিদ্যালয় এখনো জাতীয়করণের বাইরে রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রায় ২০ হাজার শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে বা সীমিত আর্থিক সুবিধায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছেন বলে দাবি তাদের।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখলেও এসব শিক্ষকের জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক শিক্ষক মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। শুধু শিক্ষকই নন, জাতীয়করণের বাইরে থাকা এসব বিদ্যালয়ের প্রায় ৮ লক্ষাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থীও সরকারি শিক্ষা-সুবিধা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষক ঐক্য পরিষদের সভাপতি মো. সোহেল রানা বলেন, ২০১৩ সালের গেজেটের আওতার বাইরে থাকা বিদ্যালয়গুলো দ্রুত যাচাই-বাছাই করে জাতীয়করণের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। তিন পার্বত্য অঞ্চল ও সাবেক ছিটমহলসহ প্রায় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান এ বঞ্চনার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বিনা বেতনে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের মানবিক দায়িত্ব। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও এসব শিক্ষক বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছেন। প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে তাদের অবদানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন।
ঐক্য পরিষদের মহাসচিব জুয়েল মিয়া বলেন, প্রান্তিক, দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার এসব বিদ্যালয় দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই কোনো ধরনের বৈষম্য না রেখে দ্রুত জাতীয়করণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি।
তার দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভৌগোলিক বাস্তবতাসহ বিভিন্ন কারণে যেসব বিদ্যালয় ২০১৩ সালের জাতীয়করণ কার্যক্রম থেকে বাদ পড়েছে, সেগুলোকে নতুন করে মানবিক ও বাস্তবতার আলোকে যাচাই-বাছাই করতে হবে। বিশেষ করে তিন পার্বত্য অঞ্চল, সাবেক ছিটমহল এবং দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকার বিদ্যালয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানান, জাতীয়করণের বাইরে থাকা বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা বছরের পর বছর নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা ছাড়াই পাঠদান করে যাচ্ছেন। নিজেদের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তারা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হতে দেননি। কিন্তু সরকারি স্বীকৃতি ও নিয়মিত বেতন-ভাতা না থাকায় তাদের জীবন হয়ে উঠেছে চরম অনিশ্চিত।
শিক্ষকদের ভাষ্য, একজন শিক্ষক যখন নিজের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খান, তখনও তিনি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অথচ সেই শিক্ষকই দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ন্যায্য আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত—এটি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি মানবিক সংকট।
তাদের মতে, ২০১৩ সালের জাতীয়করণ কার্যক্রমের পর বিভিন্ন জটিলতা ও বাস্তবতার কারণে বাদ পড়া বিদ্যালয়গুলো নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হলে প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণের আওতায় আনা সম্ভব। এতে একদিকে দীর্ঘদিনের শিক্ষক বঞ্চনার অবসান ঘটবে, অন্যদিকে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সরকারি শিক্ষা-সুবিধার আওতায় আসবে।
শিক্ষক নেতারা বলেন, এটি শুধু কয়েক হাজার বিদ্যালয় বা শিক্ষকের চাকরির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারের জীবিকা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো শিশুর শিক্ষার ভবিষ্যৎ। তাই বিষয়টিকে কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে না দেখে মানবিক ও জাতীয় শিক্ষার স্বার্থে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সমাজের দাবি, ২০১৩ সালের জাতীয়করণ কার্যক্রমে বাদ পড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে বৈষম্য ও জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে দ্রুত যাচাই-বাছাই করে জাতীয়করণ করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন বিনা বেতনে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের প্রত্যাশা, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে। কারণ, বছরের পর বছর অন্যের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়া এসব শিক্ষক এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
মন্তব্য করুন