
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কাজী মোহাইমিনুল ইসলাম নিখোঁজ হয়েছেন। রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে থেকে ঢাকাগামী বিআরটিসি বাসে ওঠার পর তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। এর আগে হলের কক্ষে তাঁর লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায়। ওই নোটে বিভাগের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তিনি। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পাশাপাশি অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, রোববার বিকেল ৩টা ৮ মিনিটে মীর মশাররফ হোসেন হলের সামনে থেকে ঢাকাগামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিআরটিসি বাসে ওঠেন মোহাইমিনুল। তিনি হলটির ‘এ’ ব্লকের ১১০ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী। পরে তাঁর কক্ষে একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায়। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাঁকে খুঁজে বের করতে সাভার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জিডি নম্বর ১১৪১। এ ছাড়া বিষয়টি জরুরিভাবে বিবেচনার জন্য ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনকে অবহিত করা হয়েছে।
নোটে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
হলের কক্ষে পাওয়া নোটে বিভাগের শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মোহাইমিনুল। তিনি লেখেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা; আমার হাতে অন্য কোনো অপশন নাই শুধু মৃত্যু ছাড়া। কারণ তারা আমাকে এই দিকে ঠেলে দিয়েছে।’ নোটে তিনি আরও লেখেন, ‘৬ মাস নাটক করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে আমাকে।’
এ ছাড়া মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ নিয়ে সহপাঠীদের উদ্দেশে একটি অনুরোধ এবং নিজের ঋণ ও পাওনার হিসাব অন্য একটি কাগজে লিখে রাখার কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।
বাবা-মায়ের উদ্দেশে লেখা আরেকটি চিঠিতে দেশের উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন মোহাইমিনুল। ছোট ভাই নাহিনকে সম্ভব হলে তুরস্কে পড়তে পাঠানোর পরামর্শও দেন তিনি।
রিটেক পরীক্ষা নিয়ে জটিলতার অভিযোগ
মোহাইমিনুলের এক সহপাঠী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁর একটি কোর্সে রিটেক পরীক্ষা বাকি রয়েছে। তিনি মূলত স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। চতুর্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষার সঙ্গে রিটেক পরীক্ষাটি দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। এতে তাঁর একটি শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ওই সহপাঠীর দাবি, শিক্ষাবর্ষটি রক্ষা করতে বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছিলেন মোহাইমিনুল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় স্বাক্ষরও সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
সহপাঠী আরও বলেন, বিশেষ পরীক্ষা আয়োজনের জন্য নতুন করে পরীক্ষা কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়ে সমাধান পেতে মোহাইমিনুলকে একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বিষয়টির সমাধান হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সহপাঠীর বক্তব্যে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষ পরীক্ষার অনুমতি, পরীক্ষা কমিটি গঠন এবং শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বিভাগের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
খোঁজে প্রশাসন, তদন্ত কমিটির সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু কাল
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, নিখোঁজ শিক্ষার্থীকে খুঁজে বের করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসন, প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডিসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কাজ করছেন। ইতোমধ্যে থানায় জিডি করা হয়েছে। পুলিশ ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। পুলিশ তাঁকে খুঁজে বের করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন।
তিনি আরও বলেন, মোহাইমিনুলের বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে ঢাকায় তাঁর কোনো বন্ধু বা আত্মীয়স্বজন থাকলে তাঁদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে উপ-উপাচার্য বলেন, কমিটি সোমবার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করবে। নিখোঁজ শিক্ষার্থীকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সবার সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেন তিনি।
মন্তব্য করুন