
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়েছে দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন। বুধবার বিকেলে লাবণী পয়েন্ট থেকে শুরু করে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকতজুড়ে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। আয়োজকদের দাবি, এবারের বিসর্জন দেখতে তিন লাখেরও বেশি মানুষের সমাগম হয়েছিল।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে সৈকতের দিকে আসতে থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। লাবণী পয়েন্টের বিশাল বালুচরে বিকেলের মধ্যেই কয়েক শ প্রতিমা সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়। প্রতিমার সামনে শেষবারের মতো পূজা, অঞ্জলি ও প্রার্থনায় অংশ নেন ভক্তরা।
দুর্গাপূজার শেষ দিনে অনেক নারী-পুরুষকে সিঁদুর খেলায় অংশ নিতে দেখা যায়। কেউ দেবীর কপাল ও পায়ে সিঁদুর দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, আবার অনেকে পরস্পরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন। উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি দেবীকে বিদায় দেওয়ার মুহূর্তে অনেকের চোখেমুখে ছিল বিষাদের ছাপ।
নির্ধারিত সময়ের পর শুরু বিসর্জন
বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিসর্জন কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে শহরের কালীবাড়ি মন্দিরের প্রতিমা সাগরে বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্য প্রতিমাগুলোও সাগরে নেওয়া হয়।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যে মোট ৩৮০টি প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করা হয়। সন্ধ্যার আগেই শেষ হয় পুরো আয়োজন।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল জানান, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে। তাঁর মতে, শান্তিপূর্ণ এই আয়োজন কক্সবাজারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
জেলায় ৩২৪ মণ্ডপে দুর্গাপূজা
এবার কক্সবাজার জেলায় মোট ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে ১৫৫টি মণ্ডপে প্রতিমার মাধ্যমে এবং ১৬৯টি মণ্ডপে ঘটপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উপজেলাগুলোর মধ্যে চকরিয়ায় সবচেয়ে বেশি ৭১টি পূজামণ্ডপ ছিল। এছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি এবং পেকুয়া ও উখিয়ায় ৯টি করে মণ্ডপে পূজা হয়েছে।
বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে কক্সবাজার শহরসহ সদর, রামু, ঈদগাঁও, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমাগুলো বিসর্জনের জন্য সৈকতে আনা হয়।
নিরাপত্তায় ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
বিসর্জনকে ঘিরে দুপুর থেকেই কক্সবাজার শহর ও সৈকত এলাকায় বাড়ানো হয় নিরাপত্তা। চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
বিপুল জনসমাগমের মধ্যেও বড় কোনো বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।
সম্প্রীতির বার্তা
বিসর্জন অনুষ্ঠানে বক্তারা কক্সবাজারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, কক্সবাজার শুধু দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র নয়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনস্থলও। সম্প্রীতির এই পরিবেশ ভবিষ্যতেও অটুট রাখার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পূজারিরা জানান, দুর্গাপূজার আনন্দ শেষে দেবীকে বিদায় দেওয়ার মুহূর্ত আবেগঘন হলেও লাখো মানুষের অংশগ্রহণ তাঁদের জন্য ছিল বিশেষ অভিজ্ঞতা। সবার মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের বিসর্জন উৎসব।
মন্তব্য করুন