
পবিত্র ঈদুল আজহা যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কামারশালাগুলোর ব্যস্ততা। জ্বলন্ত কয়লার লালচে আগুন, হাঁপরের বাতাস, আর লোহার ওপর হাতুড়ির অবিরাম ‘টুংটাং’ শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন কামারপাড়া ও বাজার এলাকা। ঈদকে কেন্দ্র করে দিন-রাত এক করে লোহার সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কারিগররা।
জ্বলন্ত চুল্লিতে দিন-রাত কাটছে কারিগরদের:
সোমবার সকালে পৌর এলাকার কলেজ বাজার ঘুরে দেখা যায়, কামার বাবুলের কামারশালায় চলছে তুমুল ব্যস্ততা। আগুনের লেলিহান শিখায় লোহা পুড়িয়ে লাল করা হচ্ছে, আর সেই তপ্ত লোহা হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে তৈরি করা হচ্ছে নতুন নতুন দা, বটি, ছুরি ও চাপাতি। একই সাথে পুরোনো ক্ষয়ে যাওয়া সরঞ্জামগুলোতে শান দিয়ে ধারালো করার কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। কামারশালার চারপাশের তীব্র উত্তাপ আর শ্রমিকদের কপাল বেয়ে পড়া ঘাম মিলিয়ে যেন তৈরি হয়েছে এক জীবন্ত শ্রমের শিল্পচিত্র।
লাভ কম হলেও সেবাই মূল লক্ষ্য:
কামারশালার কারিগর উজ্জ্বল জানান, ‘ঈদুল আজহার সময় আমাদের কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রতিদিন ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এখন আমাদের এখানে চারজন কারিগর একটানা কাজ করছেন। কেউ নতুন সরঞ্জাম বানাচ্ছেন, কেউ বা পুরোনো জিনিসে শান দিচ্ছেন।’
আয়ের বিষয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই মৌসুমে প্রতিদিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হলেও কাঁচামাল ও কয়লার দাম বাড়ায় লাভ তুলনামূলক কম। তবুও ঈদের আগে মানুষের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে আমরা স্বল্প লাভেই সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’
দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন ক্রেতারা:
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, কোরবানির ঈদকে ঘিরে কামার দোকানগুলোতে এখন এক ধরনের উৎসবের আমেজ। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামসহ দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ছুটে আসছেন তাদের প্রয়োজনীয় দা, বটি ও ছুরি শান দিতে কিংবা নতুন সরঞ্জাম কিনতে।
কামারশালায় আসা ক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, ‘ঈদের আগে কোরবানির সব সরঞ্জাম ঠিকঠাক করে রাখাটা জরুরি। সারা বছর ওভাবে সময় পাওয়া যায় না, তাই এখন একসঙ্গে সব কাজ করিয়ে নিতে এসেছি।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, কালের বিবর্তনে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ভিড়ে অনেক দেশীয় শিল্প হারিয়ে গেলেও ঈদুল আজহা এলে যেন নতুন জীবন পায় এই ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই শিল্পটি কেবল দা-বটি তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেও বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রযুক্তির এই যুগেও পীরগঞ্জের কামারদের হাতের কাজের কদর এখনো সমানভাবে উজ্জ্বল।
মন্তব্য করুন