
এলিন মাহবুব, ফিচার লেখক ও কলামিস্ট : জাতিসংঘ জন্ম নিয়েছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে মানবতার আশার প্রদীপ হয়ে। উদ্দেশ্য ছিল—যুদ্ধ ঠেকানো, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং ছোট–দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু আজ যখন আমি বর্তমান পৃথিবীর দিকে তাকাই, তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে—জাতিসংঘ কি সত্যিই তার সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে, নাকি কেবল নীরব দর্শকে পরিণত হয়েছে?
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, গণহত্যা, দখলদারিত্ব ও শরণার্থী সংকট তৈরি হচ্ছে। অসংখ্য শিশু, নারী ও বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। আর সেই সময় জাতিসংঘ কেবল বিবৃতি দিচ্ছে, উদ্বেগ জানাচ্ছে, প্রস্তাব পাস করছে—কিন্তু বাস্তবে যুদ্ধ থামাতে খুব কমই পারছে। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার প্রশ্ন—এত শক্তি, এত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন এমন অসহায় নীরবতা?
আজ যখন গাজা উপত্যকায় হাজার হাজার শিশুর আর্তনাদ আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে, কিংবা ইউক্রেনের শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, তখন জাতিসংঘ কেবল ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে নিজের দায়িত্ব সারছে। ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা কিংবা ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডের সময় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা উপস্থিত থেকেও সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। বর্তমানের সুদান বা ইয়েমেন সংকটও একই গল্পের পুনরাবৃত্তি। আমার কাছে প্রশ্ন জাগে—এত বড় একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন সাধারণ মানুষের রক্তস্রোত থামানো যাচ্ছে না?
সবচেয়ে বেশি স্তম্ভিত হতে হয় যখন ২০২৬ সালের শুরুতে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সপরিবারে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রধানকে অন্য কোনো দেশ এভাবে ‘আটক’ বা ‘অপহরণ’ করতে পারে না। অথচ জাতিসংঘ এখানেও কেবল ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ এবং ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে মন্তব্য করেই দায় সেরেছে।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর জোট বা আঞ্চলিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযান চালিয়েছে। জাতিসংঘ যেখানে রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার গ্যারান্টার হওয়ার কথা, সেখানে তারা বড় শক্তির একতরফা পদক্ষেপের সামনে স্রেফ অসহায়।
মাদুরোকে আটকের পর নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক বসলেও কোনো কার্যকর প্রস্তাব পাস হয়নি। রাশিয়ার নিন্দা আর যুক্তরাষ্ট্রের সাফাইয়ের মাঝে জাতিসংঘ কেবল একটি ‘বিতর্ক সভায়’ পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, যদি কোনো বৃহৎ শক্তির স্বার্থ বিঘ্নিত হয়, তবে তারা যেকোনো সময় যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে। জাতিসংঘ যদি এই ‘জঙ্গল আইন’ থামাতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো মূল্যই থাকবে না।
মাদুরো ইস্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, “জাতিসংঘ এখন আর শান্তি রক্ষার ঢাল নয়, বরং ক্ষমতাধরদের পেশিশক্তির কাছে এক নতজানু প্রতিষ্ঠান।”
আমার কাছে জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা মনে হয় এর নিরাপত্তা পরিষদ কাঠামো। পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা আসলে ন্যায়বিচারকে বন্দি করে রেখেছে। কখনো কখনো মনে হয়, মানুষের জীবন-মরণ নয়, বড় শক্তির স্বার্থই সেখানে আসল বিষয়। একটি দেশের ভেটোই যখন গণহত্যার বিরোধী প্রস্তাব থামিয়ে দিতে পারে, তখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারকে কতটা স্বাধীন বলা যায়?
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়েও আমার মনে গভীর প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তারা সরব, আবার কোথাও নীরবতা—এ যেন দ্বৈত মানদণ্ড। আমার কাছে মনে হয়, মানবাধিকার তখনই অর্থবহ হয় যখন তা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।
শান্তিরক্ষী বাহিনী নিয়েও আমার অনুভূতি মিশ্র। অনেক দেশে তারা সত্যিই ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে—এটা আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু তাদের হাতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা নেই। অনেক সময় তারা কেবল পর্যবেক্ষকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে অন্যদের হাতে। অস্ত্রধারী সংঘাতের সামনে সীমাবদ্ধ ম্যান্ডেট নিয়ে দাঁড়ানো শান্তিরক্ষীদের দৃশ্য আমার কাছে বেদনাদায়ক লাগে।
আমি স্বীকার করি যে ইউনিসেফ, ইউনেস্কো বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে জাতিসংঘ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য বিমোচনে অনবদ্য ভূমিকা রাখছে। পোলিও নির্মূল বা জলবায়ু পরিবর্তন রোধে তাদের প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু যখন জীবন বাঁচানোর প্রাথমিক শর্ত—অর্থাৎ ‘নিরাপত্তা’ বিঘ্নিত হয়, তখন এই উন্নয়নমূলক কাজগুলোও ম্লান হয়ে যায়।
আমার কাছে মনে হয়, জাতিসংঘের এ অবস্থার মূল কারণ কাঠামোগত দুর্বলতা। ভেটো-নির্ভর নিরাপত্তা পরিষদ, বড় শক্তির প্রভাব, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ—সব মিলেই জাতিসংঘকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। নৈতিক বক্তব্য আছে, কিন্তু প্রয়োগক্ষম হাত নেই।
আমি মনে করি, জাতিসংঘকে আজ নতুন করে ভাবতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, ভেটো ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, উন্নয়নশীল দেশের বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব এবং মানবাধিকারে একক মানদণ্ড—এসব ছাড়া জাতিসংঘ তার হারানো বিশ্বাস ফিরে পাবে না।
পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের রক্ত, কান্না আর হাহাকার আজ প্রশ্ন করছে—যে সংস্থা মানবতার শেষ আশ্রয় হওয়ার কথা, সে যদি নীরব থাকে, তাহলে আমরা আশ্রয় খুঁজব কোথায়?
—এলিন মাহবুব





