অনেক কর্মস্থলে বা এয়ারপোর্ট, বাসস্ট্যান্ড, রেলওয়ে স্টেশন, শপিং মলের মতো জনসমাগম জায়গায় ‘ব্রেস্টফিডিং কর্নার ও শৌচাগার’ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের। নিরাপদ পরিবেশের অভাবে ও যৌন হয়রানির ভয়ে মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ পান করাতে পারেন না। অথচ একজন শিশুর মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মায়ের বুকের দুধ।

শিশুদের মাতৃদুগ্ধ পানের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর জন্মের পর প্রথম দুই বছর মাতৃদুগ্ধ পান তার স্বাস্থ্যকর বেড়ে ওঠা ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে মায়ের দুধের কোনও বিকল্প নেই। তাই সব ধরনের প্রতিষ্ঠানে ব্রেস্ট ফিডিং রুমের ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। শপিং মল, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চ ঘাটসহ সব পাবলিক প্লেসে ব্রেস্ট ফিডিং রুম থাকা প্রয়োজন, যাতে সব মা তার শিশুদের মাতৃদুগ্ধের ব্যবস্থা করতে পারেন।

জনসাধারণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় ও স্বৈরাচার বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দানকারী তরুণদের হাত ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল  জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দলীয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দলটির যুগ্ন সদস্য সচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক  এস এম সুজা উদ্দিনের পরামর্শে কক্সবাজারের চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনালের মত জনবহুল এলাকায় নারীদের জন্য ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার ও শৌচাগার স্থাপনের মত জনকল্যাণমুখী কাজ করতে চায় দলটির চকরিয়া উপজেলা শাখার যুগ্ম সমন্বয়কারী মোঃ খাইরুল ইসলাম ইমরুল।

সোমবার (৬ অক্টোবর) চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর পাঠানো আবেদনপত্রে খাইরুল লিখেন, চকরিয়া উপজেলা সদর একটি জনবহুল এলাকা এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত নারী ও শিশু যাত্রী চকরিয়া বাস টার্মিনালে যাতায়াত করেন। দীর্ঘ সময় যাত্রা বা অপেক্ষার সময় নারীদের জন্য নিরাপদ বিশ্রাম ও শিশুকে দুধ খাওয়ানোর মতো উপযুক্ত স্থান নেই। তাছাড়া নারীদের ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত ও সুষ্ঠু শৌচাগারেরও অভাব রয়েছে। ফলে তারা নানাবিধ অস্বস্তি ও ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই প্রেক্ষিতে চকরিয়া শহরের বাস টার্মিনাল এলাকায় নারীদের জন্য একটি ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার ও পৃথক শৌচাগার স্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এতে নারী ও শিশু যাত্রীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং উপজেলা প্রশাসনের নারী ও শিশু বান্ধব উদ্যোগ আরও সমৃদ্ধ হবে।

আবেদনপত্র নিয়ে চকরিয়া ইউএনও অফিসে যুগ্ম সমন্বয়কারী মোঃ খাইরুল ইসলাম ইমরুল
‘ব্রেস্টফিডিং কর্নার ও শৌচাগার’ স্থাপনের জন্য ইউএনও বরাবর লেখা আবেদন পত্র।

২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইনের অধীনে কর্মক্ষেত্রে দেশে শিশু কক্ষ (বেবি কেয়ার কর্নার) স্থাপন করার বিধান রয়েছে। ২০০৯ সালে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন উৎসাহিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনসমাগম হয় এমন স্থানসহ কর্মক্ষেত্রে ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার বা মাতৃদুগ্ধ দান কক্ষ স্থাপনের নির্দেশ দেন।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জনসমাগমস্থলে ‘ ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী তার বাচ্চাকে নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ধরতে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ে তার শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর জন্য বিমানবন্দরে কোনো ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার খুঁজে না পাওয়ায় জনস্বার্থে একটি রিট করেন। দায়েরকৃত রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এক অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, আদালত, কর্মস্থল, হাসপাতাল, শপিং মল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরের মতো জনসমাগম স্থলে মাতৃদুগ্ধ দান কক্ষ ও বেবি কেয়ার স্থাপনের নির্দেশ জারি করা হয়। তখন দেশের প্রায় সব আদালতে মাতৃদুগ্ধ দান কক্ষ স্থাপিত হলেও সব জনসমাগমস্থলে মাতৃদুগ্ধ দান কক্ষ স্থাপিত হয়নি। এমন বাস্তবতায় তিন বছর আগের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, আদালত, শপিং মল, গার্মেন্ট ও শিল্পকারখানা, সরকারি-বেসরকারি কর্মস্থলসহ জনসমাগম (পাবলিক প্লেস) হয় এমন স্থানে ব্রেস্ট ফিডিং (মাতৃদুগ্ধ দান) কর্নার স্থাপনে নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। জানা যায়, এ রায়ের নির্দেশনায় শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি কর্মস্থলসহ সব পাবলিক প্লেসে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে এ কর্নার স্থাপন করতে হবে।

ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এক নারী বলেন, ছোট একটি বাচ্চা তার মায়ের কাছে বুকের দুধ পান করতে চাইতে পারে যেকোনও অবস্থায়। সেটি কর্মক্ষেত্র, শপিং মল কিংবা গণ-পরিবহন যেখানেই হোক না কেন। কিন্তু এ জায়গাগুলোতে একজন মাকে অনেক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আসলে এটা তো প্রমাণিত যে, শিশুর স্বাস্থ্যে মায়ের বুকের দুধের ভূমিকা অপরিসীম, আর জাতি হিসেবে যদি আমরা ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার স্থাপনে কৃপণতা করি— তাহলে তা জাতির ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকেই অবহেলা করার শামিল। শুধু ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার কেন, পর্যাপ্ত পরিমাণ চাইল্ড কেয়ার স্থাপন নিয়ে কেনও এখনও পরিকল্পনা হচ্ছে না, তা আমাক অবাক করে। আপনি কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কথা বলবেন, কিন্তু এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাববেন না, তা হতে পারে না।

তিনি বলেন, আমাদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। আইন ও আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে— যেন কোনও শিশু মাতৃদুগ্ধের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞান মতে, মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিশুর উচ্চতা ও ওজন হ্রাস পায়। এমনকি শিশু খর্বাকৃতি হয়ে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আমাদের দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমলেও জন্মের পর শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের দুধ না পাওয়ার কারণে কৃশকায় ও খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত শিশু ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার মতো নানা জটিল রোগের শিকার হয়ে অকাল মৃত্যুতে পতিত হতে পারে।

এছাড়া জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুষ্ঠু পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরী। সারা দেশের মানুষকে নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে সরকারী-বেসরকারী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী, ঋণপ্রদানকারী সংস্থাগুলো সারা দেশে কাজ করছে। কিন্তু নির্মম সত্য হচেছ আমাদের শহর অঞ্চলের পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই বললেই চলে। জনসমাগম এলাকায় বেশীরভাগ পয়ঃবর্জ্য যেখানে সেখানে বা রাস্তার ধারে সম্পন্ন করে। যার ফলে প্রতিনিয়তই পানি ও পরিবেশ দূষিত হয়ে নানাবিধ রোগ-ব্যাধি ছড়াচ্ছে।

মানসম্মত শৌচাগারে বা পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে নানা ধরনের পানিবাহিত রোগ সৃষ্টি হতে পারে। জনমাগম এলাকায় একটা গণশৌচাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার ফলে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ করার পাশাপাশি কৃমির কারণে যে পুষ্টিহীনতা সেটা প্রতিরোধ করা যাবে। এছাড়া নতুন প্রজন্মকে পুষ্টিবান হিসেবে গড়ে তুলতে একটি সুষ্ট ‘ব্রেস্টফিডিং কর্নার ও শৌচাগার’ স্থাপনের বিকল্প নেই।