
ডিজিটাল প্রযুক্তি এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনলাইন ক্লাস, অফিস মিটিং, সামাজিক যোগাযোগ — সবকিছুই আজ ইন্টারনেট নির্ভর। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক, সবাই এখন ভার্চুয়াল জগতে ব্যস্ত। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নতুন এক ঝুঁকি— ডিজিটাল ক্লান্তি, সাইবার বুলিং, প্রাইভেসি লঙ্ঘন এবং মানসিক চাপের মতো সমস্যা।
এই কারণেই এখন সময় এসেছে “ডিজিটাল বাউন্ডারি” বা অনলাইন সীমা সম্পর্কে নতুন করে ভাবার।
শিশুদের জন্য ডিজিটাল বাউন্ডারি:
ডিজিটাল নিরাপত্তা শুরু হোক ঘর থেকেই।আজকের শিশুরা জন্ম থেকেই স্ক্রিনের সঙ্গে বড় হচ্ছে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে মনোযোগ কমে যায় এবং সামাজিক আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকসের (২০১৬) মতে, ২–১০ বছর বয়সী শিশুদের দৈনিক স্ক্রিন টাইম ১–২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।
অভিভাবকের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারে “ডিজিটাল রুলস” তৈরি করা— যেমন খাবার টেবিলে ফোন ব্যবহার না করা, ঘুমের আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখা— শিশুকে অনলাইন শৃঙ্খলা শেখাতে সাহায্য করে।
তাছাড়া, শিশুকে শেখাতে হবে অপরিচিত কারো সঙ্গে তথ্য শেয়ার করা বিপজ্জনক, অনলাইন বুলিং বা হুমকি এলে অভিভাবককে জানানো ।প্রাইভেসি সেটিংস ব্যবহারের অভ্যাস গঠন করা।

সবচেয়ে বড় শিক্ষা আসে রোল মডেল হিসেবে অভিভাবকের আচরণ থেকে। বাবা-মা নিজেরাও যদি সীমা মানেন, শিশুরাও তা শিখে নেয় স্বাভাবিকভাবেই।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ডিজিটাল বাউন্ডারি:
ভারসাম্য আনুন অনলাইন ও বাস্তব জীবনে।প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনে সোশ্যাল মিডিয়া, অফিসের ইমেইল ও মেসেজিং অ্যাপ এখন প্রতিদিনের অংশ। কিন্তু এই অবিরাম সংযোগই কখনো কখনো মানসিক ক্লান্তি ও চাপের কারণ হয়ে ওঠে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সীমা নির্ধারণ করুন:
স্টিয়ার্স, উইকহাম ও অ্যাসিটেলি (২০১৪)–এর গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যদের “হাইলাইট রিল” দেখে মানুষ প্রায়ই নিজেকে পিছিয়ে পড়া মনে করে, যা বিষণ্ণতা বাড়ায়। তাই পোস্ট করার আগে ভাবুন— “এটা কি প্রয়োজনীয়?”
কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করুন:
ডিজিটাল ওভারওয়ার্ক মানসিক বার্নআউট সৃষ্টি করে। তাই অফিস সময়ের বাইরে ইমেইল ও মেসেজ চেক না করাই ভালো। সপ্তাহে অন্তত একদিন ‘ডিজিটাল ডিটক্স ডে’ রাখলে মন শান্ত থাকে।

অনলাইন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকুন:
টক্সিক বা ম্যানিপুলেটিভ আচরণ দেখলে ব্লক, রিপোর্ট বা দূরত্ব বজায় রাখুন। ডিজিটাল সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মসম্মান ও মানসিক শান্তি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
ডিজিটাল বাউন্ডারি রক্ষার কার্যকর কৌশল:
নিজের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই প্রাইভেসি সেটিংস নিয়মিত পর্যালোচনা করুন—যাতে আপনি ঠিক করতে পারেন কে কী দেখতে পারবে। দুই ধাপের সিকিউরিটি ব্যবহার করলে আপনার একাউন্ট আরও সুরক্ষিত থাকে। পাসওয়ার্ড নিয়মিত পরিবর্তন করুন এবং একই পাসওয়ার্ড একাধিক জায়গায় ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা “স্ক্রিন-মুক্ত” সময় রাখুন, যাতে মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায় এবং ডিজিটাল ক্লান্তি কমে। পাশাপাশি, অবাঞ্ছিত কন্টেন্ট বা বিরক্তিকর প্রোফাইল ব্লক করতে দ্বিধা করবেন না—এটি আপনার মানসিক স্বস্তি রক্ষা করবে।

ডিজিটাল বাউন্ডারি মানে জীবন সীমাবদ্ধ করা নয়, বরং নিজের মানসিক শান্তি, সম্পর্ক ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। শিশুদের শেখানো মানে সচেতন প্রজন্ম তৈরি করা। আর প্রাপ্তবয়স্করা নিজের সীমা নির্ধারণ করলে অনলাইন ও বাস্তব জীবনের ভারসাম্য ফিরে আসে।
ডিজিটাল সচেতনতা এখন আর বিকল্প নয়, এটি আমাদের নতুন প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিরক্ষা দেয়াল।
—এলিন মাহবুব





