
গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী জাহাজের মানবিক মিশন “গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায়” ইসরাইলি ‘হামলা’ ও এতে থাকা ত্রাণকর্মীদের আটকের প্রতিবাদে বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বইছে। বিশ্বনেতারা একে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জবরদস্তিমুলক বলে আখ্যায়িত করছেন। এমনকি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আন্তর্জাতিক অপরাধ করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। কড়া নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে মালয়েশিয়া, আর্জেন্টিনা, আয়ারল্যান্ড, তুরস্ক, ভেনেজুয়েলা সহ বিভিন্ন দেশ। একাধিক দেশ তার বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইতোমধ্যে ইসরাইলের পুরো কূটনৈতিক মিশনের সদস্যদের বহিষ্কার করেছে কলম্বিয়া। তারা ইসরাইলের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করেছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ইসরাইলের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিক ও গাজার জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজগুলোকে বাধা দিয়ে ইসরাইল ‘ভয়ভীতি প্রদর্শন ও জবরদস্তি’ করেছে। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘একটি মানবিক মিশনকে বাধা দিয়ে ইসরাইল শুধু ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারকেই উপেক্ষা করেনি, বরং বিশ্বের বিবেককেও অবমাননা করেছে। ফ্লোটিলা হলো সংহতি, সহমর্মিতা ও অবরুদ্ধ মানুষের জন্য মুক্তির আশার প্রতীক।’
আনোয়ার ইব্রাহিম আরও জানান, মালয়েশিয়া সব ধরনের বৈধ ও আইনি উপায়ে ইসরাইলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে, বিশেষ করে মালয়েশিয়ান নাগরিকদের ব্যাপারে।
ফ্লোটিলা মুখপাত্র সাইফ আবু কাশেক জানিয়েছেন, ইসরাইল যে ১৩টি জাহাজ আটক করেছে তার মধ্যে প্রায় ১২ জন মালয়েশিয়ান নাগরিক আছেন।
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আয়ারসে গাজাগামী সহায়তা ফ্লোটিলা আটকানো ও কর্মী গ্রেপ্তারের কারণে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। বার্তা সংস্থা এপি বলছে, আটক হওয়া জাহাজ আদারা’তে আছেন সেলেস্ট ফিয়েরো। তিনি বুয়েনস আয়ারস শহরের নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতা (ওয়ার্কার্স সোশ্যালিস্ট মুভমেন্টের পক্ষ থেকে)।
প্রতিবাদে অংশ নিয়ে সের্হিও গার্সিয়া বলেন, আমাদের সহযোদ্ধারা সেখানে কঠিন পরিস্থিতিতে আছেন, আমরা নজরদারি করছি। আমরা সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি করছি যেন সেলে (ফিয়েরো) দ্রুত আমাদের কাছে ফিরে আসতে পারেন, যেন আমরা তাকে আলিঙ্গন করে স্বাগত জানাতে পারি।
আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস বলেন, ইসরাইলি বাহিনীর হামলার পর তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছেন যারা ফ্লোটিলায় অংশ নিয়েছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি ছিল একটি শান্তিপূর্ণ মিশন, যা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের ওপর আলোকপাত করছিল। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফ্লোটিলার সদস্যদের সঙ্গে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে আচরণ করতে হবে। আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ফ্লোটিলায় থাকা আইরিশ নাগরিকদের সহায়তায় মনোযোগী এবং তাদের নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে আছে।
ওদিকে, ফ্লোটিলার একটি জাহাজে অবস্থানরত ফরাসি ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টের সদস্য এমা ফোরো ইসরাইলের অভিযানের নিন্দা জানিয়ে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, সব কিছু অবরোধ করো, ইসরাইলকে অবরুদ্ধ করো, বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করো। ফ্লোটিলার মিশন শেষ করি: অবরোধের অবসান ঘটাও, গাজায় গণহত্যা থামাও!
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসরাইলের ফ্লোটিলা আটকানোর তীব্র সমালোচনা করেছে। সরকারি বার্তা সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় শান্তিপূর্ণভাবে চলা বেসামরিক জাহাজে সামরিক অভিযান চালিয়ে নিরীহ মানুষের জীবন হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, গাজাকে অনাহারে দমিয়ে রাখা যে গণহত্যামূলক নীতি নেতানিয়াহুর সরকার চালাচ্ছে, তা শুধু ফিলিস্তিনিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
তুরস্ক জানিয়েছে, আটক হওয়া তুর্কি নাগরিকদের মুক্তির জন্য সব পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং অভিযুক্ত ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল টেলিগ্রামে লিখেছেন, ইসরাইলি সেনারা একটি বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ মিশনে হামলা করেছে, যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি জনগণের কাছে ৫,৫০০ টন মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়া। তিনি বলেন, মানবিক সহায়তায় অবরোধ হলো পরিকল্পিত যুদ্ধের হাতিয়ার, গণহত্যারই আরেকটি রূপ। নির্বিচার বোমাবর্ষণের পাশাপাশি অনাহারে মানুষকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালাচ্ছে জায়নিস্ট শাসন।





