
কাশ্মীরের পেহেলগামে গত এপ্রিল মাসে পর্যটকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার জেরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ভারত। নয়াদিল্লি এখন সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে চেনাব নদীর পানি প্রত্যাহারের পরিকল্পনায় অগ্রসর হচ্ছে, যা পাকিস্তানের কৃষি নির্ভর অঞ্চলগুলোর জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রয়টার্সকে দেওয়া একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভারত রণবীর খাল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে, যা বর্তমানে চেনাব নদীর সঙ্গে যুক্ত এবং পাকিস্তানের পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত। খালটির দৈর্ঘ্য দ্বিগুণ করে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। এর ফলে ভারত বর্তমানে প্রতি সেকেন্ডে ৪০ ঘনমিটার পানি ব্যবহার করার পরিবর্তে ১৫০ ঘনমিটার পর্যন্ত পানি সরাতে পারবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েক বছর লাগলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশাল।
সিন্ধু পানি চুক্তি এবং বর্তমান সংকট:
১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি এত দিন বৈরী সম্পর্কের মধ্যেও টিকে ছিল। চুক্তি অনুযায়ী, সিন্ধু, চেনাব ও ঝিলম নদীর পানি পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ এবং ভারত এসব নদী থেকে সীমিত পরিমাণ পানি ব্যবহার করতে পারে। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর নয়াদিল্লি এই চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দেয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি মন্তব্য করেন, ‘রক্ত ও পানি একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না।’ পানিসম্পদমন্ত্রী সি আর পাটিলও জানান, ‘এক ফোঁটা পানিও যেন পাকিস্তানে না যায়, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।’
পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশহাক দার বলেছেন, চুক্তি স্থগিত করা অবৈধ, এবং ইসলামাবাদ এখনো একে কার্যকর বলেই গণ্য করে। পাকিস্তান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, পানিপ্রবাহ বন্ধ করা যুদ্ধ ঘোষণার সামিল।
কৌশলগত প্রকল্প ও সম্ভাব্য প্রভাব:
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ভারত ইতিমধ্যে চেনাব ও ঝিলম নদীর উপনদীতে পাঁচটি নতুন জলাধার প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি, জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা তিন গুণ বাড়ানোরও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সব উদ্যোগ পাকিস্তানে পানির প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এসব প্রকল্পে এগিয়ে গেলে পাকিস্তানের ৮০ শতাংশ কৃষিজমি ও প্রায় ২৫ কোটি মানুষের পানির উৎস চরম হুমকির মুখে পড়বে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষক ডেভিড মিশেল বলেন, ‘সিন্ধু নদীর পানি আটকে রাখতে প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের কয়েক বছর সময় লাগবে। তবে কৌশলগতভাবে এটি উদ্বেগজনক।’
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়া:
পাকিস্তান বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক, হেগের সালিশি আদালত ও আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব বলেন, ‘পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ধরনের পরিস্থিতি অগ্রহণযোগ্য।’
আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করছেন। ভারতীয় অধ্যাপক হ্যাপিমন জ্যাকব মনে করেন, দিল্লি কাশ্মীর ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ সংকুচিত করে শুধুমাত্র পানি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে মনোযোগ দিচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন বিশ্লেষক ডেভিড মিশেল আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই কৌশল চীনকেও ভারতের বিরুদ্ধে একই পথ অনুসরণের সুযোগ করে দিতে পারে।’
বিশ্বের অন্যতম সফল পানিবণ্টন চুক্তি হিসেবে পরিচিত সিন্ধু পানি চুক্তি এখন চরম সংকটে। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে বাড়তে থাকা উত্তেজনা, এবং পানিকে কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত করার প্রবণতা এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।





